তরুণদের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আয় দুরন্ত, আয়রে আমার কাঁচা’। কবি এভাবে তরুণদের আহ্বান করেছিলেন এ কারণে যে- তিনি বিশ্বাস করতেন তরুণদের আছে ‘অফুরান প্রাণ’। সেই প্রাণ দিয়ে তারাই পারবে ‘জীর্ণ জরা ঝরিয়ে’ দিতে। কেবল রবীন্দ্রনাথ নন, নজরুল ইসলামও তারুণ্যের প্রতি নির্ভরশীল ছিলেন। আর তাই তারুণ্যের জয়গানে তারও আহ্বান ছিল। তরুণ দলকে ঊষার দুয়ারে আঘাত করে রাঙা প্রভাত ছিনিয়ে আনতে বলেছিলেন দৃঢ়কণ্ঠে। আবার একদিকে তারুণ্য অপরদিকে প্রতিবাদী চেতনার বিশাল স্ফুলিঙ্গ ধারণকারী মানবিক এক অধ্যায় ছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রনাথ যার জন্য কান পেতে ছিলেন আর নজরুল যার আগমনের আকাঙ্খায় প্রহর গুনেছেন। ক্ষণজন্মা সুকান্তই বলে গিয়েছিলেন- ‘আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়’।
অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আমরা বলতে চাই, দৈনিক আমাদের সময় আজ সেই আঠারোর কোঠায়। বিগত সময়ের বহু বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এসে আমরাও এখন শানিত। সুকান্তের সেই দৃপ্ত শপথ লালন করে এবার বুকে ধারণ করেছি ‘পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে’। করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে গত বছর বলেছিলাম- আমরা এখন আরও উদ্যমী। বৈশ্বিক সংকটেও সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে সুযোগ পেয়েছি তার শতভাগ সার্থকতা অটুট রাখার লক্ষ্যে চেষ্টা ছিল সর্বোচ্চ। কবির ভাষায় ‘দুঃসহ আঠারো’র বুকে পা দিয়ে তাই সগৌরবে বলতে চাই- আমাদের নেই কোনো সংশয়।
সংশয়-সঙ্কোচ না থাকলেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে ঠিকই। বিশ্ব পরিস্থিতির নানা হিসাব-নিকাশ; মেরুকরণের নেতিবাচক প্রভাব; দেশের অর্থনীতির সূচকের ওঠানামা একটি সংবাদপত্রের জন্য কতটা রক্তচক্ষুর ন্যায় তা প্রতিদিনের পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে আমাদের কঠিনভাবে উপলব্ধি করতে হচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইন সংবাদমাধ্যম বা টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য সংবাদশৈলীতে নিত্যনতুন সংযোজন-বিয়োজনে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকার সক্ষমতা অর্জন করার প্রণান্ত চেষ্টায় থাকতে হচ্ছে ছাপা সংবাদপত্রকে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিচিত্র চরিত্রকেও আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। এসব মেনে নিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখা সত্যিই দুরূহ।
একদিকে অতিমারীর প্রবল ধাক্কা অন্যদিকে রাজনীতির বিশ্ব প্রেক্ষাপট আমাদের আরেকটি অভিজ্ঞতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরস্পর যোগসাজশের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নিজেদের ছেদ পড়ায় মুদ্রাস্ফীতির শিকার হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। অভ্যন্তরীণ কিছু অতি মুনাফালোভীর কারসাজির কারণে সরকারের নানা উদ্যোগের পরও প্রতিদিনের জীবনচাহিদা পূরণে মানুষের অপারগতার চিত্র ফুটে উঠছে। গণমাধ্যমে এখন বহুল চর্চিত বিষয় হচ্ছে- নিত্যপণ্যের মূল্য এবং মূল্যবৃদ্ধির সিন্ডিকেট। পেটের চাহিদার জোগানে যেমন টান পড়েছে তেমনই ঘাটতি রয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। বাস্তবতার কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে নতুন শিল্প উদ্যোক্তার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ানো কষ্টকর। দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। এসবের বাইরেও মাঝে মাঝেই গণমাধ্যমে উঠে আসছে নানা দুর্নীতির বিষবৃক্ষের দাপট, যা সত্যিই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এভাবে হয়তো তালিকা আরও দীর্ঘতর হবে। তবে এত সব নেতিবাচক বিষয়ে আমরা নিমগ্ন থাকতে চাই না।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, কোনো প্রতিকূলতা বাঙালি জাতিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। ২০০৯ সালে দেশে দারিদ্র্য ছিল ৪০ শতাংশ। সেখান থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে। পদ্মা বহুমুখী সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু টানেল, গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে মাথা উঁচু করে নিজের জানান দিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। লাখ-লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের পোশাকশিল্প আজ বিশাল প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ এখন আমাদের জন্য অসম্ভব মর্যাদার বিষয়। প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে দূর প্রবাসে থাকা লাখো প্রবাসীর কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সে মজবুত হচ্ছে দেশের অর্থনীতির ভিত। বুকভরা চাপা কষ্ট আর চোখভরা রঙিন স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের তরুণ সমাজ। বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাশীল দায়িত্বে আসীন রয়েছেন বাংলার দামাল ছেলেরা। শিক্ষিত তরুণরা এখন কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, তরুণরাই এখন কৃষির প্রাণ। কৃষিকাজে জড়িতদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। এই অপূর্ব ঘটনা আজকাল আমাদের আরও বেশি ইতিবাচক করে তোলে। তরুণদের নিবিড় আগ্রহে নানা নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে দেশের কৃষি খাতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আজ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট যেমন আমাদের মহাকাশ জয়ের পথিকৃৎ তেমনই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় তিন তরুণের তৈরি করা ন্যানো স্যাটেলাইট ব্র্যাক অন্বেষাও আমাদের জন্য অনেক গৌরবের। তরুণদের কাঁধে ভর করে তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিকশিত হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্বপ্ন নয়, সত্যি। দেশের দেড় লাখের বেশি তরুণ এখন তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরাসরি জড়িত। টাইগারদের টিম বাংলাদেশ ক্রিকেটে আজ আমাদের জন্য বড় ব্র্যান্ডিং।
আঠারোতে পদার্পণের এই শুভক্ষণে আমরা প্রতীকী হিসেবে দেশের সম্ভাবনাময় ও উদ্যমী ১৮ তরুণ ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা জানানোর জন্য বেছে নিয়েছি। যারা শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এগিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের। ভূমিকা রাখছেন স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে। এই ১৮ জন হলেন- বাংলাদেশ হুইলচেয়ার স্পোর্টস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি নূর নাহিয়ান; শারীরিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে চতুর্থবার জিপিএ-৫ পাওয়া তামান্না আক্তার নুরা; ফারজানা ড্রয়িং একাডেমির স্বত্বাধিকারী ফারজানা; অভিনেতা সিয়াম আহমেদ; ‘ফুটস্টেপস’র প্রতিষ্ঠাতা শাহ রাফায়াত চৌধুরী; ওয়ান্ডার ইউমেনের প্রতিষ্ঠাতা সাবিরা মেহরিন সাবা, অগ্রগামী স্থানীয় ভ্রমণকারী মুমিনুল হক ফাহিম; মোনার্ক হোল্ডিংস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী সাদিয়া হাসান; আইসিডিডিআরবির মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী আনিসউদ্দিন আহমেদ; লেখক মাহবুব ময়ূখ রিশাদ; ইন্সপায়ারিং উইমেন ইন ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট মেম্বার অব দ্য ইয়ার পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি সৈয়দ সাদিয়া হোসেন; সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিচার্স, বাংলাদেশের (সিপিআরবি) প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবং সহযোগী বিজ্ঞানী মো. আল-আমিন ভূঁইয়া; বিষয়বস্তু নির্মাতা, মডেল ও সামাজিককর্মী সোবিয়া আমীন এবং ‘গোল্ডেন বয় অব মুয়ে থাই’ মাসজেদুল রেজা ওমিও। সংগঠন হিসেবে পুরস্কার পাচ্ছে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন; বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন; স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্ভাবনা এবং পাঠাগার জলসিঁড়ি। আমরা জানি, দেশের প্রত্যেক লড়াকু তরুণ এই সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য। আমরা এই ১৮ জনের মাধ্যমে সব তরুণের মাঝে নিজেদের নিয়ে যেতে চেয়েছি। এবারের জন্মদিনেও আমরা দেশের বিশিষ্ট-বিদগ্ধজনের মহামূল্যবান লেখায় সমৃদ্ধ বিশেষ আয়োজনের ব্যবস্থা করেছি। পাঁচ দিনে পাঁচ পর্বের এসব আয়োজনেও আমাদের প্রধান উপজীব্য তারুণ্য। সুন্দর আগামীর শুভযাত্রার প্রত্যয় নিয়ে আমাদের প্রথমপর্বটি সাজানো। দ্বিতীয় পর্বে থাকবে- সমৃদ্ধির পথে। এর পর প্রযুক্তি ও প্রজন্ম; স্বাস্থ্য-তথ্য-নারী এবং সব শেষে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি।
প্রিয় পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী, আমরা গর্বের সঙ্গে জানাতে চাই- আমাদের সময় পরিবারও আজ একদল স্বপ্নবাজ তরুণের প্রাণের ঠিকানা। প্রতিষ্ঠানটির উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের প্রতিনিয়ত যত্নে এই মেলবন্ধন দিন দিন সুদৃঢ় হচ্ছে। এই আনন্দযাত্রায় আমাদের সব সহকর্মীকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। কৃতজ্ঞতা জানাই পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতাদের। আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আসুন দেশব্যাপী আনন্দে মেতে উঠি। আমাদের সময়ের কার্যালয়ের আম্রকাননে শুভেচ্ছা আদান-প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে শুভানুধ্যায়ীদের জানাই সাদর আমন্ত্রণ।
সব শেষে বলতে চাই, করোনা মহামারী এখনো নির্মূল হয়নি। তাই আমাদের সজাগ থাকতেই হবে। মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের নতুন স্বাভাবিক জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করি। সবার জন্য শুভকামনা। জয় হোক তারুণ্যের।