আজ ২৩ জুন, আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। উপমহাদেশের রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে এ দলটি গণমানুষের কাছে একটি আদর্শ ও অনুভূতির নাম। বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বাঙালির মুক্তির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত পাকিস্তান জন্মের পর পরই ধর্মকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র পরিচালনার নামে শোষণ, শাসন ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত শুরু করে। ফলে বাঙালির মনে অল্প দিনেই ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। সেই সঙ্গে নব্য পাকিস্তানের জন্মতেই পাকিস্তান মুসলিম লীগে ভাঙনের সুর বেজে ওঠে। এ অবস্থায় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল ধারাটি এগিয়ে যাওয়ার বিকল্পপথ খোঁজে।
তৎকালিন ১৯৮১, ১৯৮২ প্রথমে গণতান্ত্রিক শাসনের ছদ্মাবরণে নেপথ্যের কুশীলব জেনারেল এরশাদের স্বমূর্তিতে আবির্ভাব। পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরে নানা মত ও পথের উপদলীয় কোন্দল। ক্ষতবিক্ষত দল। ১৯৮৩-তে দলের অভ্যন্তরের চক্রান্তে একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক ধাক্কা খেল আওয়ামী লীগ। আব্দুর রাজ্জাক ও মহিউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে দলের অভ্যন্তরের একটি বড় অংশ দল ছেড়ে বাকশাল নামে নতুন দল গঠন করেন। তারও আগে এ উপদলের নেতৃবৃন্দ ছাত্রলীগকে দ্বিধাবিভক্ত করেন। রাজ্জাক-মহিউদ্দিনের এ ভাঙন দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বেশ দুর্বল করে দেয়।
তখন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। বলতে দ্বিধা নেই যে, দলের ভাঙন রোধে শেখ হাসিনা যে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন, তার সাক্ষী ওবায়দুল কাদের সাহেব। কিন্তু দলের অভ্যন্তরস্থ কট্টর ডানপন্থিদের কূটকৌশল এবং রাজ্জাক পন্থিদের অনমনীয় অবস্থান তার সকল প্রকার প্রয়াসকে ভেস্তে দেয়। দল ভেঙে যায়। এ সময় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসন আর সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেও বিচলিত ও বিভ্রান্ত করতে পারেনি।
দলের প্রধান বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বলেন,তখন তরুণ যুবকরা দলে পাশে দাঁড়িয়েছিলো নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে। যদিও এ সময়টা আমি রাজনীতির বাইরে ছিলাম, তথাপি তার পাশে থেকে তাকে সহায়তা করার দায়িত্বকে কর্তব্য জ্ঞান করেছি। ওবায়দুল কাদের, মমতাজ হোসেন, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসেন, আব্দুল মান্নান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শাহে আলম, অসীম কুমার উকিল, সুলতান মনসুর আহমেদ, আব্দুর রহমান প্রমুখ এ সময়টাতে ছায়ার মতো তার সঙ্গে থেকে সহায়তা করেছেন। জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে আব্দুস সামাদ আজাদ, জিল্লুর রহমান, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, মহিউদ্দিন চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন মন্টু, ড. কামাল হোসেন, আব্দুল জলিল, মো. নাসিম, আইভী রহমান, মতিয়া চৌধুরী প্রমুখ আমাকে শক্তি-সাহস জুগিয়েছেন নিরন্তর। অন্যদের মধ্যে টাঙ্গাইলের মান্নান, নেত্রকোনার মমিনের নামও উল্লেখ করা যেতে পারে। একটা সময় পর্যন্ত ফনিভূষণ মজুমদারও আমাকে সহায়তা করেছেন। মিজান চৌধুরী, দেওয়ান ফরিদ গাজী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু তখন অন্য সংগঠন ও দল করেন আওয়ামী লীগ নামে।
বাঙালির স্বাধীনতার জন্য আওয়ামী লীগের জন্ম অপরিহার্য ছিল, বাঙালির এগিয়ে যাওয়াতেও দলটির অপরিহার্যতা প্রমাণিত। বাংলাদেশকে আদর্শরাষ্ট্রে পুনর্গঠন করার জন্য দলটি একইভাবে নিরন্তর লড়াই ও কাজ করে চলছে। এখানেই এ রাজনৈতিক দলের বিশেষত্ব। এই দিনে এ দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি যেসব নেতা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।