আজ ঢাকায় আসছেন ডোনাল্ড লু

দুই দিনের সফরে আজ মঙ্গলবার (১৪ মে) ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথমবার ঢাকা সফরে এসে লু দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দেবেন বলে ইঙ্গিত রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শ্রীলঙ্কা থেকে ঢাকায় আসবেন লু। ঢাকা সফরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে হতে যাওয়া বৈঠকগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রম অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা ইস্যু, প্রতিরক্ষাসহ নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনা হতে পারে। নিরাপত্তা ইস্যুকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়ে ওয়াশিংটন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে চাইবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান বিষয়গুলো গণতন্ত্র, মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রাখবে ওয়াশিংটন।

ঢাকার দায়িত্বশীল এক কূটনীতিক বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রধানমন্ত্রীকে যে চিঠি লিখেছেন, সেখানে কিন্তু বার্তা স্পষ্ট করা হয়েছে। চিঠিতে দেশটি কোন কোন খাতে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী তা উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতাম, সেগুলোর ব্যাপ্তি আরও কীভাবে বাড়ানো যায় বা এগিয়ে নেওয়া যায় সেগুলো নিয়ে লু আলোচনা করবেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো, পরিবেশগত সুরক্ষা বা জলবায়ু পরিবর্তন; এক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর বা বিনিয়োগের বিষয়ও রয়েছে। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা সহযোগিতা এটার মধ্যে এন্টি টেরোরিজম অ্যাসিস্ট্যান্ট রয়েছে, পুলিশ-র‌্যাবের তহবিল রয়েছে, সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত অংশীদারিত্ব ইস্যু রয়েছে। তারপর মানবিক সহায়তা বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে রোহিঙ্গাদের সহায়তার বিষয় যুক্ত। এ ছাড়া রাইটস ইস্যু আছে; এর মধ্যে মানবাধিকার, গণতন্ত্র বা লেবার রাইটস ইস্যু আছে।

লু ঢাকা সফরের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নৈশভোজে যোগ দেবেন। এদিন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের কথা রয়েছে তার। এ ছাড়া একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করতে পারেন তিনি।

সফরের দ্বিতীয় দিনে লু প্রথমে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ও পরে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করবেন। পরে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

ঢাকা সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ চেয়েছেন ডোনাল্ড লু। তবে এখনো সরকারপ্রধানের সঙ্গে লুর সাক্ষাতের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।

ডোনাল্ড লুর ঢাকা সফরে নিরাপত্তা ইস্যু প্রধান অগ্রাধিকার হবে জানিয়ে এক কূটনীতিক বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সেই অর্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করা। অর্থাৎ ইন্দো-প্যাসিফিক দেশগুলোকে পেতে চাওয়া। এ দেশগুলোকে হাত করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র সামনের দিনে চীনের বিরুদ্ধে তাদের ব্যবহার করতে পারবে। এখন যেকোনো উপায়ে চীন ঠেকাও নীতিতে আছে যুক্তরাষ্ট্র। কেননা, বিশ্বজুড়ে চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সহযোগিতা সম্প্রসারণে দুই দেশের চলমান অংশীদারিত্ব আরও ব্যাপ্ত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের পাঁচটি ক্ষেত্র ও এর বাইরে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহের ক্ষেত্রগুলো নিয়ে মতামত জানাতে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) অনুরোধ করেছে।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ এপ্রিল ঢাকায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

হাছান মাহমুদ বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। প্রধানমন্ত্রী চতুর্থবার নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট চিঠি লিখে সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ার বা নতুন উচ্চতায় নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন প্রশাসন থেকে যারাই বাংলাদেশে সফর করুক না কেন, আমাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আমরা কাজ করব একসঙ্গে। সেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে, আমাদের নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা আছে।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে বিশ্ব গণমাধ্যমে লুর কথা উঠে এসেছে। সেই থেকে লু দক্ষিণ এশিয়ায় একটি পরিচিত নাম। বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি ইস্যুতে আলোচনায় ছিল লুর নাম।

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর চারবার বাংলাদেশ সফর করেছেন লু। গত বছরের জুলাইতে তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ সফর করেন। তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি আজরা জেয়ার সঙ্গী হয়ে ঢাকায় আসেন।

বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশ সরব অবস্থানে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভোট শেষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে ওয়াশিংটন জানায়, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। পরবর্তীতে ভোট নিয়ে নিজেদের অনঢ় অবস্থানের জানান দিলেও বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহের কথা জানান খোদ ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির ‘আলোচিত’ রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলনে একই বার্তা দেন।

তবে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চিঠিতে। চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী তার সরকার।

ফেব্রুয়ারির শুরুতে বাইডেনের চিঠির পর ওই মাসের শেষের দিকে ঢাকা সফর করেন তার (মার্কিন প্রেসিডেন্টের) বিশেষ সহকারী ও দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক এইলিন লাউবাখেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। ওই প্রতিনিধি দলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-ইউএসএআইডির সহকারী প্রশাসক মাইকেল শিফার ও যুক্তরাষ্ট্রের উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আখতার ছিলেন। আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের প্রথম সফর ছিল।

সবশেষ চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয়ের (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে এক‌টি প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকা সফর করে গেছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *