না বুঝেই ওরা বিদায় জানাল বাবাদের

বাবাদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে ভিন্ন ধরনের পোশাক পরিধান করানো হয়েছে তাদের। ছোট্ট এই তিন শিশু বুঝতে পারছে না কেন তাদের এমন বেশ ধারণ করানো হয়েছে। কোমলমতি এই শিশুদের দেখে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের হাসিনাপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় এমন হৃদয়বিদারক অনুষ্ঠানের।

মৃত সুরেশ চন্দ্র সুশীলের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানো মৃত পাঁচ সন্তান অনুপম সুশীল, নিরুপম সুশীল, দিপক সুশীল, চম্পক সুশীল ও স্মরণ সুশীলের বাঁধানো ছবি সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজনস্বরূপ এইভাবে সাজানো হয়েছে তাদের ছবিগুলো। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছে তাদের স্বজনরা। বাবাহারা ছোট্ট শিশুদের একনজর দেখতে ছুটে এসেছেন এলাকাবাসীও। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের এক পাশে চলছে কীর্তন। ব্রাক্ষণ-পুরোহিতরা ছোট্ট শিশুদের ধর্মীয় মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করছেন। তবে শিশুরা এতটাই ছোট যে, এসব মন্ত্র ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারছে না। তাদের পরিবর্তে ব্রাহ্মণ-পুরোহিতরা মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে প্রয়াত পাঁচ ভাইকে অর্ঘ্য নিবেদন করছেন। একপাশে বসে রয়েছেন তাদের মা ও ঠাকুর দিদি সদ্য প্রয়াত পাঁচ সন্তানের শোকে পাগলপ্রায় মা মৃণালিনী বালা সুশীল।

শোকাহত পরিবারের এক প্রতিবেশীর বাড়িতে ছোট্ট পরিসরে এলাকার লোকজন মিলে আয়োজন করেছে শাকান্ন ভোজনের। এই শাকান্ন ভোজের আয়োজন করা হলেও কেউ এই শাকান্ন ভোজ খেতে আগ্রহী না। একটি পরিবারের এমন করুণ পরিণতি দেখে শোকে কারও মুখে যেন ভোজের আহার উঠছে না।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ব্রাহ্মণ শিমুল চ্যাটার্জি বলেন, আমার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। ত্রিশ বছর যাবৎ শ্রাদ্ধানুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পুজো করে যাচ্ছি। এই ত্রিশ বছরের জীবনে শত শত শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছি। কিন্তু কখনো এমন শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিনি। এমন শ্রাদ্ধানুষ্ঠান যাতে আমাকে আর করতে না হয় পরম দয়ালের কাছে এই আমার প্রার্থনা।

সদ্য প্রয়াত সুরেশ চন্দ্র সুশীলের (পিকআপভ্যানের চাপায় নিহত ৫ সন্তানের বাবা) ছোট ভাই ব্যাংকার চিত্তরঞ্জন সুশীল বলেন, ‘এমন দৃশ্য দেখা খুবই কষ্টের। বাবা হারানো ছোট্ট শিশুদের কাঁধে এমন গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে ভাবতেও পারছি না। এছাড়াও এই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলতে কেউ নেই। যে দুই ভাই বেঁচে আছে তাদের মধ্যে রক্তিম সুশীল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। প্রতিদিন লক্ষ টাকার উপরে খরচ। এই খরচ মিটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। আরেক ভাই প্লাবন সুশীল সেই ওইদিন ঘাতক পিকআপের চাপায় গুরুতর আহত হয়ে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন। আহত আরেক বোন হীরা রানী সুশীলও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’

স্বামী-সন্তান হারানো মৃণালিনী বালা সুশীল মানু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার সব শেষ। বেঁচে থেকেও মরে গেছি। যেই নাতি-নাতনিদের খেলার মাঠে থাকার কথা তারা আজ প্রয়াত বাবাদের শ্রাদ্ধ করতে হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো হতো। আমায় ছেড়ে সবাই চলে গেছে, বাকি যেই দুই ধন (সন্তান) বেঁচে আছে অন্তত তাদের যাতে বাঁচাতে পারি সেই জন্য সরকারের কাছে আকুল মিনতি করছি।

চারদিনও গাড়ির চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ

গত মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মৃত সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান উপলক্ষে ক্ষুধান্ন দান করতে গিয়ে সবজি বোঝাই পিকআপের চাপায় ঘটনাস্থলে নিহত হন পাঁচ ভাই। এ সময় আহত হন দুই ভাই ও এক বোন। এ ঘটনার পরদিন ডুলাহাজারা ইউনিয়নের রংমহলের একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে ঘাতক পিকআপকে জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় চকরিয়া থানায় একটি মামলাও হয়েছে।

কিন্তু ওই ঘটনার চারদিন অতিবাহিত হলেও চালক-হেলপারকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তবে, ওই পিকআপের চালক-হেলপারকে গ্রেপ্তার করতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) শাফায়েত হোসেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *